নিউজ ডেস্ক, বিডি লাইভ ২৪ নিউজ
একসময় রূপকথার গল্প, ছড়া কিংবা মজার কথা শুনিয়ে শিশুদের খাওয়ানো বা ঘুম পাড়ানো হতো। সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। এখন অনেক শিশুকে খাবার খাওয়াতে কিংবা শান্ত রাখতে হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে স্মার্টফোন। কার্টুন, গেমস কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটছে তাদের সময়।
ফলে অল্প বয়সেই স্মার্টফোন ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইসে আসক্ত হয়ে পড়ছে শিশুরা। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে খেলাধুলার মাঠের সংকট ও ঘরবন্দি জীবনের কারণে এই নির্ভরতা আরও বাড়ছে। অনেক অভিভাবকও সন্তানের বায়না মেটাতে হাতে তুলে দিচ্ছেন স্মার্টফোন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত সময় মোবাইল ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের কারণে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখের নানা সমস্যাও দেখা দিচ্ছে।
সম্প্রতি ইউনিসেফের তথ্যের বরাত দিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে প্রতি তিনজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর একজন শিশু। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক শিশু নতুন করে ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। বাংলাদেশেও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে শিশু-কিশোরদের অনলাইন উপস্থিতি ক্রমেই বাড়ছে।
রাজধানীর খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা চাকরিজীবী আবুল হোসেন বলেন, তার সন্তানের সকাল শুরু হয় মোবাইল দিয়ে। মোবাইল না দিলে খেতে চায় না, কান্নাকাটি করে। কাজের ব্যস্ততার কারণে অনেক সময় বাধ্য হয়েই ফোন দিতে হয়।
মতিঝিলের এক স্কুলশিক্ষার্থীও জানায়, খাওয়ার সময় এমনকি ঘুমানোর সময়ও সে মোবাইল ব্যবহার করে। বাসায় বসে ফেসবুক চালানো ও গেমস খেলাই তার অন্যতম বিনোদন।
আরেক অভিভাবক খাইরুল ইসলাম জানান, মোবাইল ব্যবহারের কারণে তার সন্তানের আগের রুটিন নষ্ট হয়ে গেছে। রাতে দেরিতে ঘুমানো, সকালে দেরিতে ওঠা এবং ঘুম থেকে উঠেই মোবাইল খোঁজার অভ্যাস তৈরি হয়েছে।
চক্ষু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় মোবাইল বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইসের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকলে শিশুদের চোখে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে চোখ জ্বালাপোড়া, লাল হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত পলক ফেলা, চোখ দিয়ে পানি পড়া এবং মাথাব্যথা উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ভিট্রিও রেটিনা সোসাইটির সহ-সভাপতি ডা. তারিক রেজা আলী বলেন, মোবাইল ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসে অতিরিক্ত আসক্তির কারণে বর্তমানে অনেক বেশি শিশু চোখের সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে আসছে।
তিনি জানান, এসব সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে শিশুদের মায়োপিয়া বা চোখের মাইনাস পাওয়ার বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। মায়োপিয়ায় আক্রান্ত শিশু কাছের জিনিস তুলনামূলক ভালো দেখলেও দূরের বস্তু স্পষ্ট দেখতে সমস্যায় পড়ে।
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফা বলেন, একটানা কম্পিউটার, মোবাইল কিংবা যেকোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইসের দিকে তাকিয়ে থাকা সবার চোখের জন্যই ক্ষতিকর। শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, অনেক অভিভাবক শিশুদের চোখের সমস্যা গুরুত্ব দিয়ে দেখেন না এবং নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করান না। ফলে সমস্যা ধীরে ধীরে আরও প্রকট হতে পারে। বর্তমানে চোখ ও মাথাব্যথার মতো সমস্যা নিয়ে অনেক শিশুই হাসপাতালে আসছে এবং তাদের একটি অংশের চশমার প্রয়োজন হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহারের সময় সীমিত রাখা, নিয়মিত বিরতি দেওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা এবং বাইরে খেলাধুলার সুযোগ বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন। একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও সন্তানদের মোবাইল ব্যবহারের ওপর নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তারা।