বলিউডে তার মূল পরিচয় নৃত্যশিল্পী, অভিনেত্রী ও দুর্দান্ত এক পারফরমার হিসেবে। কিন্তু বর্তমান বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবল–ভক্তের কাছে নোরা ফাতেহির পরিচয়টা আরেকটু ভিন্ন এবং অনেক বেশি মর্যাদার। তিনি মূলত এমন এক বৈশ্বিক তারকা, যিনি নিজের নাচ, সংগীত ও ফুটবলের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা—এই তিন ভিন্ন জগতকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলেছেন। চলমান ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে নোরার জমকালো পারফরম্যান্স নতুন করে তাকে আন্তর্জাতিক আলোয় ও আলোচনায় এনেছে। তবে বিশ্বকাপের মতো এত বড় মঞ্চে তার উপস্থিতি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং ফুটবলের সঙ্গে তার আত্মিক সম্পর্ক বহু বছরের পুরোনো। তার মরোক্কান শিকড়, বিশ্বকাপ–উন্মাদনা, জাতীয় দলের প্রতি গভীর আবেগ এবং আন্তর্জাতিক ফুটবল–সংস্কৃতির সঙ্গে তার নিবিড় সংযোগ তাকে বলিউডের অন্য অনেক তারকার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা করে তুলেছে।
নোরা ফাতেহির জন্ম ও বেড়ে ওঠা কানাডায় হলেও তার পরিবার মরোক্কান বংশোদ্ভূত। আর মরক্কো এমন একটি দেশ, যেখানে ফুটবল শুধু একটি সাধারণ খেলা নয়; এটি তাদের জাতীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শৈশব থেকেই নোরা এক প্রবল ফুটবল পরিবেশের মধ্যে বড় হয়ে উঠেছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, বিশ্বকাপ এলে তাদের পরিবারে এক অন্যরকম উৎসবের আবহ তৈরি হতো। আত্মীয়স্বজন সবাই একসঙ্গে খেলা দেখতেন এবং প্রিয় দলের জন্য উল্লাস করতেন।
ফলে ফুটবলের প্রতি এই নিখাদ ভালোবাসা তার রক্তেই যেন মিশে আছে। নোরার এই ফুটবল-সংযোগ সবচেয়ে বড় আলোচনায় আসে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সময়। সেই বিশ্বকাপে মরক্কো ইতিহাস গড়ে প্রথম আফ্রিকান ও প্রথম আরব দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে ওঠে। পুরো আরব বিশ্ব যখন চরম উচ্ছ্বাসে ভাসছিল, তখন সেই বৈশ্বিক আবেগের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন নোরা ফাতেহি। বিশ্বকাপ চলাকালে বিভিন্ন গ্যালারিতে ও অনুষ্ঠানে মরক্কোর জাতীয় পতাকা হাতে দেখা যায় নোরাকে।
বলিউডে নোরার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা এসেছে ‘দিলবার’, ‘ও সাকি সাকি’, ‘নাচ মেরি রানি’র মতো সুপারহিট গানের মাধ্যমে। কিন্তু ফুটবল তাকে পৌঁছে দিয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আন্তর্জাতিক দর্শকগোষ্ঠীর কাছে। কাতার বিশ্বকাপের অফিশিয়াল সাংস্কৃতিক আয়োজনগুলোতে অংশ নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো তাকে নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। অনেকেই বলেছিলেন, বলিউডের কোনো নৃত্যশিল্পীর জন্য এটি বিরল এক বৈশ্বিক অর্জন। ফুটবলপ্রেমীদের চিরন্তন বিতর্ক—লিওনেল মেসি নাকি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো? এই প্রশ্নে নোরা কখনো খুব স্পষ্টভাবে কোনো এক পক্ষ নেননি। তবে তিনি এই দুই জীবন্ত কিংবদন্তির প্রতিই তার গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন।
রোনালদোর কঠোর পরিশ্রম ও শৃঙ্খলা যেমন নোরাকে মুগ্ধ করে, ঠিক তেমনি মেসির মাঠের সৃজনশীলতা ও খেলার নান্দনিক সৌন্দর্যের প্রশংসাও করেছেন তিনি। তার মতে, ফুটবল–ইতিহাসের এই দুই মহাতারকাকে একই সময়ে খেলতে দেখা যেকোনো ফুটবল ভক্তের জন্য পরম সৌভাগ্য। ২০২৬ সালের এই মেগা বিশ্বকাপেও নোরার রাজকীয় উপস্থিতি নতুন করে তাকে আলোচনার শীর্ষে নিয়ে এসেছে। উদ্বোধনী ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে তার এনার্জেটিক পারফরম্যান্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বকাপের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে একজন বলিউড তারকার এমন নিয়মিত উপস্থিতি ভারতীয় উপমহাদেশের দর্শকদের জন্যও বিশেষ গর্বের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।